মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

সাংগঠনিক কাঠামো

স্থানীয় সরকার

স্থানীয় সরকার নিম্নতম পর্যায়ের বা স্থানীয়ভাবে সংগঠিত সরকার ব্যবস্থা। বাংলায় সব যুগেই স্থানীয় সরকার ছিল; তবে বিভিন্ন যুগে এর ধরন ছিল ভিন্নতর। গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানই স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তুলেছিল, আর এ প্রতিষ্ঠানের ওপরই মূলত নির্ভরশীল ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার সরকার ব্যবস্থা। গ্রামসমাজ নিজ নিজ শাসনকার্য পরিচালনা করত। রাজা খাজনা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠান ছিল, যেমন গ্রামপ্রধান ও গ্রাম পরিষদ ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে দু’ধরনের উদ্দেশ্য ছিল, একদিকে রাজস্ব আদায় এবং অন্যদিকে উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করা এবং রাজ্যে সুখ ও সমৃদ্ধি বজায় রাখা। সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ, গ্রামিকা অথবা গ্রামপাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অধীনে স্থানীয় প্রশাসনের প্রকৃতি কেমন ছিল তার বিস্তারিত আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণাদি নেই। খুব সম্ভবত গ্রাম পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন স্তরে কেন্দ্রীয় শাসন সম্প্রসারিত ছিল, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ছিল না। সম্ভবত সেখানে সামাজিক পরিষদ গঠনের মাধ্যমে এক ধরনের স্থানীয় পরামর্শক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল।

মধ্যযুগে স্থানীয় সরকার ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলায় তুর্ক-আফগান শাসন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ইতিহাসবিদগণ মধ্যযুগের শুরু বলে গণ্য করে থাকেন। মধ্যযুগে গ্রাম প্রশাসন ছিল পঞ্চায়েতের হাতে। প্রতি গ্রামে পরিষদ বা পঞ্চায়েত ছিল। এ পরিষদই গ্রাম প্রধান নিয়োগ বা নির্বাচন করত। গ্রামপ্রধান গ্রাম এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করতেন। গ্রামপ্রধান কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রেরণ করতেন। রাজস্ব সংগ্রহে বিলম্ব ঘটলে তাকে জবাবদিহি করতে হতো। শস্য এবং রাজস্বের হিসাব রক্ষণের জন্য গ্রামপ্রধানের তত্ত্বাবধানে একজন পাটওয়ারী বা গ্রাম হিসাবরক্ষক থাকতেন। গ্রামের অধিবাসীদের শিক্ষা, জলসেচ, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং নৈতিক আচরণ তদারকির দায়িত্ব ছিল পঞ্চায়েতের। মেলা অনুষ্ঠান ও উৎসবাদি উদ্যাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও পঞ্চায়েতের উপর ন্যস্ত ছিল।

প্রাচীন যুগের মতো মধ্যযুগে একই ধরনের প্রশাসনিক ইউনিট ছিল কিনা তা সুস্পষ্ট নয়। তবে মনে হয়, মুগল আমলে রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা অনেকটা সংগঠিত রূপ লাভ করে এবং শেষদিকে স্থানীয় প্রশাসন অধিকতর গতিশীল ছিল। ফলে মুগল শাসনামলে রাজস্ব ও সাধারণ প্রশাসনের মূলকেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয় সরকার/চাকলা ও পরগণা। মধ্যযুগে পরিষদ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় আলোচনা ও মতবিনিময়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ব্যবস্থাটি ছিল নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের শাসনের বিস্তৃতি। এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রাম পর্যায়ে স্বশাসিত সরকার বিরাজমান ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মধ্যযুগে বিশেষ করে মুগল আমলে বাংলায় শহর গুরুত্ব লাভ করে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তাদের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল শহরাঞ্চলে। এ যুগে নগর সংস্থার মূলভিত্তি হিসেবে কোতোয়ালের কার্যালয় স্থাপিত হয়। সম্রাটের সনদের মাধ্যমে কোতোয়াল নিয়োগ লাভ করতেন। তিনি ছিলেন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ছিল তার  প্রধান দায়িত্ব। তিনি নগর রক্ষীবাহিনী, গুপ্তচর বাহিনী এবং একপাল ঘোড়া পোষণ করতেন। নগর জীবনের প্রায় সবকিছুই ছিল তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় সরকার ব্রিটিশ শাসন প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর তেমন হস্তক্ষেপ করে নি। কেবল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের অপসারণ ঘটায়, আর বিলেতি মডেলের নতুন ধরনের স্থানীয় শাসন চালু করে। পরগণা ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটানো হয় এবং একইভাবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থারও। স্থানীয় সরকারের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন এবং আদালত; আর জমিদার ও অন্যান্য ভূম্যাধিকারী সমাজের স্বাভাবিক নেতায় পরিণত হন।

অবশ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে জমিদারি প্রতিষ্ঠান তার সম্ভাবনা হারায়। ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান এবং সংসদীয় অঙ্গীকার এদেশের জনগণকে বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের অংশীদার করে তোলে, আর স্থানীয় শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। তাই সরকার চৌকিদারি আইন ১৮৭০ পাস করে। এ আইনে ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হয়। এ আইন গ্রাম পর্যায়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট পঞ্চায়েত নিয়োগ করার ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ন্যস্ত করে। গ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য চৌকিদার নিয়োগ করা ছিল পঞ্চায়েতের প্রাথমিক কাজ। চৌকিদারের বেতন প্রদানের জন্য গ্রামের জনগণের কাছ থেকে খাজনা নির্ধারণ ও আদায় করাও ছিল পঞ্চায়েতের কাজ।

ভাইসরয় লর্ড রিপন (১৮৮০-১৮৮৪) সরাসরি পশ্চিমা স্ব-শাসন পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করেন। ১৮৮২ সালে তাঁর প্রশাসন স্ব-শাসিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বেঙ্গল কাউন্সিলে লোকাল সেলফ্ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮৫ পাস হয়। গ্রামীণ অঞ্চলের জন্য এতে তিন স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিধান করা হয়; যথা, প্রত্যেক জেলায় জেলা বোর্ড, মহকুমায় স্থানীয় বোর্ড এবং কয়েকটি গ্রামের জন্য ইউনিয়ন কমিটি।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জেলা বোর্ড ছিল প্রাণকেন্দ্র এবং এ বোর্ডকে ব্যাপক ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করা হয়। স্থানীয় বোর্ড জেলা বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত এবং জেলা বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাই শুধু স্থানীয় বোর্ড প্রয়োগ করত। স্থানীয় বোর্ড ইউনিয়ন কমিটির তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে এবং গড়ে ১২ বর্গমাইল এলাকা ব্যাপী প্রশাসনের যেকোন দায়িত্ব ইউনিয়ন কমিটির হাতে অর্পণ করতে পারে। ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয় ইউনিয়নের অধিবাসীর মধ্য থেকে পাঁচ জনের কম বা নয় জনের বেশি নয় এমন সদস্য নিয়ে।

গ্রাম বাংলায় স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করার দ্বিতীয় বৃহত্তম পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯১৯ সালের আইনে। এ আইন বলে ইউন

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :

Facebook Twitter